1. admin@prothomctg.com : admin :
বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৯:৩৮ অপরাহ্ন

উদ্যোক্তা তৈরির তহবিল প্রভাবশালীদের পকেটে

কালবেলা
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২ জানুয়ারি, ২০২৪
  • ২০ বার পঠিত

দেশে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০০১ সালে জামানতবিহীন এবং সুদমুক্ত একটি বিনিয়োগ কর্মসূচি চালু করে সরকার। প্রথম দফায় ১০০ কোটি টাকা দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘ইক্যুইটি অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ফান্ড’ (সমমূলধন উদ্যোক্তা তহবিল, সংক্ষেপে ইইএফ) গঠন করে। বর্তমানে এই তহবিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। বিশাল এই উদ্যোগে দুই দশকের বেশি সময়ে দেশে কী পরিমাণ নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হলো—কালবেলার পক্ষ থেকে তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে বড় ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র বেরিয়ে এসেছে।

সদ্য সমাপ্ত ২০২৩ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত এই তহবিল থেকে মোট ২ হাজার ৬৩টি প্রকল্পে ৩ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন হয়েছে। এর মধ্যে কৃষি ও তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাত এবং শেয়ার ফেরত নেওয়ার (বাই-ব্যাক) শর্তে ২ হাজার ২২৫ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে কৃষি ও আইসিটি খাতের ১ হাজার ৩৯টি প্রকল্পে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ১ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে আদায় হয়েছে মাত্র ৫১৯ কোটি টাকা। বাকি টাকার প্রায় পুরোটাই লুটেপুটে খেয়েছেন রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও প্রশাসনিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই কর্মসূচির গোড়া থেকেই রাষ্ট্র তথা জনগণের টাকা লুটপাটের সুযোগ সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত ও তথ্যপ্রযুক্তি—এই তিনটি খাতে যারা কিছু করার উদ্যোগ নিয়েছেন, সরকার তাদের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে যৌথভাবে বিনিয়োগের জন্য তহবিলটি গঠন করে। বিধান রাখা হয়, উদ্যোক্তা প্রথমে ৫১ শতাংশ অর্থ বিনিয়োগ করবে; তারপর সেখানে সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ৪৯ শতাংশ বিনিয়োগ করবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সরকারের পক্ষ থেকে একজন পরিচালক নিযুক্ত থাকবেন। তিনিও উদ্যোগটি যাতে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়, সেটি দেখভাল করবেন।

বিধি-বিধানে বলা হয়, সরকারের কাছ থেকে ৫১ শতাংশ বিনিয়োগ পাওয়ার জন্য উদ্যোক্তাকে কোনোরকম জামানত দিতে হবে না; সুদ বা কোনো লভ্যাংশও দিতে হবে না। শুধু আট বছরের মধ্যে সরকারের কাছ থেকে পাওয়া টাকাটা ফেরত দিলেই হবে। কিন্তু কেউ যদি ফেরত না দেয়, তাহলে কী হবে? এখানেই রয়ে গেছে শুভঙ্করের ফাঁকি। ঋণ নিয়ে কেউ তা ফেরত না দিলে তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—সে বিষয়ে বিধিমালায় কিছুই বলা হয়নি। আর এই ফাঁক ব্যবহার করেই মহতী উদ্যোগটির বিপুল পরিমাণ অর্থ সাবাড় করে দিয়েছেন সুযোগসন্ধানীরা।

অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথম পাঁচ বছরে ২৩৬টি প্রকল্পে ৫৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। যার মধ্যে ২০টি প্রকল্প থেকে মাত্র ৪০ কোটি টাকা আদায় হয়। ওই সময় ইইএফে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ পেয়ে তৎকালীন গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ ২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বিনিয়োগ বন্ধ রাখেন। পরে ২০০৯ সালের জুন মাসে এই তহবিলের বিনিয়োগে সাব-এজেন্সি হিসেবে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) সঙ্গে ১০ বছরের চুক্তি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে বিধিবিধান সব আগের মতোই রাখা হয়।

নীতিমালা অনুযায়ী আট বছরের মধ্যে সরকারি বিনিয়োগ ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও সেই সময়সীমা পার করা প্রকল্পের সংখ্যা ৭৪৭টি। এগুলোতে সরকার থেকে বিনিয়োগ করা হয়েছে ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে আদায় হয়েছে মাত্র ৪৭৪ কোটি। বাকি ৭৮৬ কোটি টাকার হদিস নেই। এ ছাড়া তিন থেকে আট বছরমেয়াদি ২৮২টি প্রকল্পে বিনিয়োগ রয়েছে ৩৫১ কোটি; আদায় হয়েছে মাত্র ২৭ কোটি টাকা। বাকিটা সাবাড় হয়ে গেছে। কিন্তু নীতিমালার কারণে অর্থঋণ আদালতে যেতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা আইসিবি। এ বিষয়ে এক সময় বিশিষ্ট আইনজ্ঞ প্রয়াত ব্যারিস্টার রফিকুল হকের শরণাপন্ন হয়েছিল কর্তৃপক্ষ। তার পরামর্শে সরকারি টাকা যারা ফেরত দেননি, তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা শুরু করা হয়। এভাবে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযোগে ২৭৪টি মামলা করেছে আইসিবি। এসব মামলার মাত্র সাতটিতে ডিক্রি পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। মামলার পর এখন পর্যন্ত আদায় হয়েছে মাত্র ২৮ কোটি টাকা। এমন পরিস্থিতিতে যারা এসব প্রকল্পের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, তাদের দায়দায়িত্ব নিরূপণে গত এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কথা ছিল, দুই মাসের মধ্যে এই কমিটি প্রতিবেদন জমা দেবে। কিন্তু ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও তা হয়নি।

এর মধ্যে ২০১৮ সালের ১২ আগস্ট নতুন নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে বিনিয়োগ তহবিলটির নাম পরিবর্তন করে ‘এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ সাপোর্ট ফান্ড (ইএসএফ)’ করা হয়। নিয়মকানুনও কঠোর করা হয়। সরকার থেকে ৫১ শতাংশ বিনিয়োগ পেতে উদ্যোক্তাদের জন্য মর্টগেজ এবং ২ শতাংশ সুদ বাধ্যতামূলক করা হয়। এমনকি অনাদায়ী অর্থ আদায়ের জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও সুযোগ রাখা হয়। অনেকটা ব্যাংক ঋণের মতোই এসব শর্ত আরোপ করায় বিনিয়োগের গতি শ্লথ হয়ে যায়। ২০১৮ সালের ১২ আগস্ট থেকে গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এই তহবিল থেকে ১৩টি প্রকল্পে মাত্র ১৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়, যা আদায়ের সময় এখনো হয়নি।

সদ্যবিদায়ী বছরে আইসিবি জাতীয় সংসদের কাছে ১৯৮টি প্রকল্পের পরিদর্শন প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ৫৭টি প্রকল্প উৎপাদনে, ৭৫টি আংশিক উৎপাদনে, ৪৭টি স্থবির এবং ১৮টি প্রকল্পের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। আর অনিয়মের কারণে যে তৎকালীন গভর্নর চার বছর পর্যন্ত বিনিয়োগ বন্ধ রাখেন, সে তথ্যও আইসিবির প্রতিবেদনে উল্লেখ রাখা হয়েছে।

মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের (সিএজি) এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বগুড়া জেলার আদমদিঘীর কদমার ইফাডাফ অ্যাকুয়া লিমিটেডে ২০০৪ সালের আগস্ট মাসে মাছের হ্যাচারি ও মাছ চাষের জন্য ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ইইএফ। একই বছরের নভেম্বরে মিশ্র সার উৎপাদনে জেলার শিবপুরে শারীব এগ্রো নামে আরেক প্রতিষ্ঠানে ৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়। ৬৪ জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি জিডিপিতে বার্ষিক ৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা জোগান দেওয়া প্রতিশ্রুতিতে গড়ে ইফাডাফ প্রকল্পে যে জমি দেখানো হয়েছিল, তার পুরোটাই খাস জমি। আর কৃষি খাতে অবদানের প্রতিশ্রুতিতে গড়ে উঠা শারীব এগ্রোও বন্ধ হয়ে গেছে অল্প দিনেই।

কালবেলার অনুসন্ধানে জানা যায়, এই প্রতিষ্ঠান দুটি ২০০৫-০৬ সালে তৎকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নওগাঁ-৬ আসনের সাবেক সাংসদ আলমগীর কবিরের ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন বুলুর। ভাইয়ের প্রভাব খাটিয়ে ইইএফ থেকে ৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বিএনপির এই নেতা। প্রতিষ্ঠান দুটির মধ্যে শারীব এগ্রো প্রথম দিকে চালু হলেও অল্প কয়েকদিনের মধ্যে তা বন্ধ হয়ে যায়। আর ইফাডাফ অ্যাকুয়া প্রকল্পের হ্যাচারির কোনো অস্তিত্ব খুঁজে না পাওয়া গেলেও কয়েকটি পুকুরে মাছের পোনা চাষ করা হচ্ছে। মামলা করার পরও এসব অর্থ ফেরত দেননি উদ্যোক্তা।

জানতে চাইলে প্রকল্পের মালিক ও বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেন বুলু বলেন, ‘হ্যাঁ, ঋণ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কতটুকু পরিশোধ হয়েছে, তা দেখে বলতে হবে। আমি এখন গাড়িতে আছি। পরে কথা বলব।’

এরপর তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।

সিএজির আরেক প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইইএফ থেকে ৬৩ লাখ টাকা নেয় হবিগঞ্জ সদর উপজেলার শরিফাবাদে অবস্থিত কুতুবুল আউলিয়া মৎস খামার। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি আর আইসিবির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেনি। পরে নিরীক্ষক দল সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দুজন তত্ত্বাবধায়কের উপস্থিতি পেয়েছেন। যদিও প্রকল্পের কোনো অফিস ঘর বা সরঞ্জাম পাওয়া যায়নি। এই প্রকল্পের আয়-ব্যয়ের হিসাব বা অন্য কোনো তথ্যও সংরক্ষণ করা হয়নি। পরে প্রকল্পের প্রধানের সঙ্গে নিরীক্ষক দল দেখা করতে চাইলে তিনি দেখা করেননি।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, কুতুবুল আউলিয়া মৎস্য খামারের মালিকানায় ছিলেন জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আজিজুল বারী কামাল। ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে তিনি অর্থ নিয়ে তা আর পরিশোধ করেননি। পরে ২০১৪ সালে আজিজুল বারী কামাল সড়ক দুর্ঘটনা মারা গেলে প্রকল্পের দায়িত্ব নেন তারই ভাই জাসদ নেতা শফিকুল বারি আওয়াল। সরেজমিন দেখা যায়, প্রকল্পটি আংশিক চালু রয়েছে, তবে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ নেই।

জানতে চাইলে আওয়াল বলেন, ‘আমরা ইইএফের টাকা পরিশোধের চেষ্টা করছি। আশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যে পরিশোধ করতে পারব।’

২০০৩ সালের নভেম্বরে গ্রিনটেক গ্রিন হাউসে ৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ইইএফ। এ ক্ষেত্রে ইইএফের নীতিমালা অমান্য করে প্রতিষ্ঠানটির জমির স্বত্ব যাচাই না করেই এই ঋণ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইসিবির এক প্রতিবেদনের বলা হয়েছে, যে জমির বিপরীতে এই ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, তার দাম দেখানো হয়েছে ১৩ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু ওই জমির বাজারমূল্য ছিল ৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।

অনুসন্ধান বলছে, প্রতিষ্ঠানটি সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক (সাবেক) আবদুল আউয়াল পাটওয়ারী ও তার সহযোগী শাহ আলমের। ইইএফের বিনিয়োগের ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা ওই দুজন তাদের অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে স্থানান্তর করেছেন। ইইএফের কোনো টাকাই ওই প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়নি।

এর পরও আবদুল আউয়াল পাটওয়ারীর অন্য প্রতিষ্ঠান ‘পাটওয়ারী পটেটো ফ্লাক্স’কে চিপস উৎপাদনের জন্য ২০০৪ সালের এপ্রিল মাসে আরও ৪ কোটি টাকা দেওয়া হয়। এক ব্যক্তির একাধিক প্রতিষ্ঠানে ইইএফ থেকে বিনিয়োগ করা নীতিমালাবিরোধী হওয়ার পরও প্রভাব খাটিয়ে এই ঋণ নিয়েছেন আবদুল আউয়াল। তার দুটি প্রতিষ্ঠানের কোনোটিই উৎপাদনে যেতে পারেনি। ‘বিধিবহির্ভূতভাবে ইইএফের অর্থছাড় করার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করা চাকরি বিধিমালার পরিপন্থি বলেও বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইসিবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এই প্রকল্পগুলোর বিরুদ্ধে আইসিবি মামলা করেছে; তবুও টাকা ফেরত দেননি উদ্যোক্তা।

পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়ার সিপাইপাড়ায় হলুদ ও মরিচের গুঁড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য ইইএফ থেকে কিছু শর্তে ৩ কোটি ১২ লাখ টাকা বিনিয়োগ নেয় রয়েস হর্টিকালচার নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে একর জমি আইসিবিকে দেখালেও ওই জমির দলিল এমটিবির ঠাকুরগাঁও শাখায় বন্ধক রাখা ছিল। এ ছাড়া সুপারি চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য রয়েস এগ্রো ফারমার্স লিমিটেডের অনুকূলে ২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ইইএফ সুবিধা মঞ্জুর করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সুপারিশে এই বিনিয়োগ অনুমোদন করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। বর্তমানে এই দুই প্রকল্পের পুরো টাকাই অনাদায়ী। এমনকি মামলার পরও এসব অর্থ ফেরত আসেনি।

লালমনিরহাটের সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর কামরুল হাসান আজাদ ২০০৪ সালে প্রভাব খাটিয়ে ইইএফ ফান্ড থেকে ৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা বিনিয়োগ নিয়ে লালমনিরহাটের মহেন্দ্রানগর এলাকায় গড়ে তোলেন লালমনি ফিশারিজ হ্যাচারি অ্যান্ড ফিড মিলস। এর প্রায় পাঁচ বছর পর ২০১২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইসিবি পরিদর্শনে দেখতে পায়, প্রকল্পটির হ্যাচারি ইউনিট ও ফিড মিল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। আর ২৫টি পুকুরের চার থেকে পাঁচটিতে মাছের পোনা চাষ করা হচ্ছে। সম্প্রতি সরেজমিন দেখা গেছে, মেজর কামরুল হাসান মারা যাওয়ার পর এসব সম্পদের মালিক হয়েছেন তার ছেলে ও মেয়ে। পুকুরগুলোতে মাছের চাষ হচ্ছে, তবে ফিড মিল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। বড় দায়-দেনার কারণে কামরুলের ছেলে মেহেদী হাসান প্রতিষ্ঠানটি হারাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খন্দকার সিরাজুল ইসলাম ও আওয়ামী লীগ নেতা আমিনুল ইসলাম খানকে লিজ দিয়েছেন। সেখান থেকে আসা অর্থ দিয়েই পরিশোধ হচ্ছে আগের দেনা।

জানতে চাইলে আমিনুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা কামরুল সাহেবের ছেলের কাছ থেকে মাছ চাষ করার জন্য পুকুরগুলো লিজ নিয়েছি। মেহেদীও পার্টনার হিসেবে আছেন। আমরা বৈশাখ থেকে বৈশাখ মাছ চাষ করি। এ বছর পানি আসতে দেরি হয়েছে। তাই মাছ ছাড়তেও দেরি হয়েছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কোনো ঋণের বিষয়ে তারা আমাদের কিছু জানায়নি।’

বায়োটেক ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী ডা. ফেরদৌসী বেগম ইইএফ থেকে ২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা নিয়ে গড়ে তোলেন ফেরদৌস বায়োটেক। ২০০৪ সালে ইইএফ থেকে অর্থ নিলেও এখন পর্যন্ত প্রকল্পটি থেকে মাত্র ১৪ লাখ টাকা ফেরত এসেছে। একই অবস্থা বাগেরহাটের লখপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা শেখ শরীফ উদ্দিন মিঠুর গড়ে তোলা সালমান পোলট্রি অ্যান্ড হ্যাচারির। ২০১২ সালে ৩ কোটি ২২ লাখ টাকা নিলেও এই প্রতিষ্ঠান থেকে ফেরত আসেনি কিছুই। হ্যাচারিটি চালু থাকলেও বাণিজ্যিক উৎপাদনে নেই। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী এই সাবেক চেয়ারম্যান এখন গ্রামেও থাকেন না।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে আইসিবির ইইএফ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক আল আমিন তালুকদার বলেন, ‘বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা শর্ত পরিপালন করেছে কি না, আমরা সে বিষয়গুলো দেখি। তিনি কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি কি না, তা দেখা হয় না। সেক্ষেত্রে কোনো কোনো প্রভাবশালীর প্রকল্পে বিনিয়োগ হয়ে থাকতে পারে। সেটা তো উদাহরণ নয়।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, ‘উদ্যোক্তা তৈরির জন্য সরকার ইইএফ গঠন করেছে। প্রথম দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক বিনিয়োগের দায়িত্বে ছিল। এখন দায়িত্ব আইসিবির হাতে। সুতরাং এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করাই ভালো।’

Facebook Comments Box
এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

ফেসবুকে আমরা

© স্বত্ব সংরক্ষিত। © ২০১৬ প্রথম চট্টগ্রাম। @ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
প্রযুক্তি সহায়তায় Shakil IT Park