1. admin@prothomctg.com : admin :
বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০১:০৮ অপরাহ্ন

ধর্মীয় শিক্ষা বাড়ছে সাধারণে কমছে

প্রথম চট্টগ্রাম ডেস্ক :
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৩
  • ১৩ বার পঠিত

দেশে গত চার দশকে সাধারণ শিক্ষায় পাঁচ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর হার কমেছে। অন্যদিকে বেড়েছে ধর্মীয় শিক্ষায়। গত বছর আদম শুমারির প্রতিবেদনে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। শিক্ষাবিদদের মতে, খরচ বৃদ্ধি ও নানা সময়ে সংস্কারের ফলে বিভ্রান্তির কারণে অভিভাবকদের মধ্যে মূলধারার শিক্ষার প্রতি কিছুটা হলেও অনীহা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষায় খরচ কম। বড় কোনো পরিবর্তনও আসেনি।

জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, পাঁচ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সী মানুষদের মধ্যে ১৯৮১ সালের আদম শুমারিতে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী ছিল ৯৭ দশমিক ১৮ শতাংশ। কিন্তু ২০২২ সালের জনশুমারিতে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮৯ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ ৪১ বছরের ব্যবধানে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কমেছে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ।

অন্যদিকে ১৯৮১ সালে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর হার ছিল ২ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২২ সাল শেষে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ১৯ শতাংশে।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, মূলধারার চেয়ে মাদ্রাসায় আগ্রহ জন্মানোর মূল কারণ অর্থনৈতিক। তাছাড়া সাম্প্রতিক বেশ কয়েকবার শিক্ষা কারিকুলাম পরিবর্তনের কারণে অভিভাবকরাও মূলধারার শিক্ষা নিয়ে বিভ্রান্ত। ফলে মাদ্রাসা শিক্ষায় ঝুঁকতে হচ্ছে তাদের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মূলধারায় পড়াশোনা করতে অনেক অর্থ ব্যয় হয়, বিপরীতে অনেক মাদ্রাসায় কম খরচে পড়াশোনা করা যায়। কওমি মাদ্রাসায় তো টাকাই লাগে না, সেখানে গেলে নিরাপদে থাকে।’

মূলধারার শিক্ষায় ত্রুটি বেশি বলে মনে করেন এ শিক্ষাবিদ। তিনি বলেন, ‘মূলধারার শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে নানান ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়। আমি মনে করি এটিও ক্ষতিকর। একবার পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ায়, আবার কমায়, আবার সৃজনশীল পদ্ধতি আনে দেখা গেল এগুলো কেউ বোঝে না। শেষ পর্যন্ত এগুলোতে দেখা যায় কোনো লাভ হলো না।’

নতুন শিক্ষা কারিকুলাম নিয়েও অভিভাবকরা বিভ্রান্ত জানিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘মূলধারার জটিলতার আরেকটি হলো আমরা নতুন শিক্ষাক্রম চালু করতে যাচ্ছি। সেখানে বিজ্ঞানকে আরও কমিয়ে আনা হবে। মূল্যায়ন পদ্ধতি কীভাবে হবে সেটিও ঠিক করতে পারছে না। অভিভাবকরাও প্রতিবাদ করছেন। ভালো শিক্ষার জন্য ভালো শিক্ষক দরকার। ভালো শিক্ষকের সরবরাহ বাংলাদেশে কম, তাদের সামাজিক সম্মানও কম। ভালো মেধাবীদের শিক্ষক হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘মূলধারার আরেকটি অংশ চলে যাচ্ছে ইংরেজি মাধ্যমে। এ মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে চলছে। এখানকার কারিকুলাম এত দ্রুত পরিবর্তন হয় না। আগে থেকেই জানা যায় সেখানে কী ধরনের কারিকুলাম থাকবে।’

মাদ্রাসায় যাওয়ার আরেকটি কারণ নৈতিক শিক্ষার ধারণা বলেও মনে করেন এ শিক্ষাবিদ। তিনি বলেন, ‘মাদ্রাসায় যাওয়ার প্রধান কারণ অর্থনৈতিক। এর বাইরেও সেখানে নৈতিক শিক্ষাও দেওয়া হয়। সেটা অবশ্য ভ্রান্ত ধারণা। এটা খুব দুঃখজনক যে, মূলধারার শিক্ষাই তো আসল ধারা। কিন্তু আমরা সে চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করতে পারিনি। এখন এ তিন ধারার শিক্ষার বিভাজন শ্রেণি বিভাজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

সর্বশেষ শুমারির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন বলছে, মূলধারা বা সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১০ কোটি ৫৭ লাখ ৭৬ হাজার ৩৬৫ জন, কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত ৯ লাখ ৫৯ হাজার ৫৬৭ জন, ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত ৮৫ লাখ ২১ হাজার ৬৫৭ জন। এ ছাড়া অন্যান্য (ইংরেজি মাধ্যম) শিক্ষায় শিক্ষিত ৩২ লাখ ৫২ হাজার ৭১৪ জন।

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার (ইউনেসকো) পরামর্শ হলো, শিক্ষায় জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ ব্যয় করা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতের সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মিলিয়ে মোট বরাদ্দ জিডিপির ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

গত কয়েক দশকে মূলধারার শিক্ষাকে বেগবান করার জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে সবচেয়ে বেশি। প্রতি বছর মূলধারার শিক্ষার জন্য যে বরাদ্দ থাকে সে বরাদ্দের প্রায় ৯০ শতাংশ যায় ভবন নির্মাণ, পূর্তকাজ, বেতন-ভাতা পরিবহন, বিভিন্ন ক্রয় খাতে। শ্রেণি শিক্ষা, শিক্ষক ট্রেনিং, ল্যাব, প্রশিক্ষণসামগ্রী এবং গবেষণা বরাদ্দ সব মিলে অনূর্ধ্ব ১০ শতাংশ মাত্র। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর খরচ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গড় গবেষণা ব্যয় সর্বোচ্চ ১ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে গবেষণা করেছে। তাদের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে শিক্ষায় বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে থাকার মূল কারণ। ‘বৈশ্বিক উন্নয়ন প্রতিবেদন-২০১৮ : শিক্ষার প্রতিশ্রুতি বোঝার শিক্ষা’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। বড় কারণের মধ্যে রয়েছে মানহীন পাঠদান, স্কুল ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, সরকারি খাতের শিক্ষায় স্বল্প বরাদ্দ ও শিশুর বিকাশমূলক কর্মসূচির অভাব। এসব সমস্যা সমাধানে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ আরও বাড়ানো এবং বিনিয়োগের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। বলা হয়, পড়াশোনায় দুর্বলতার কারণে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত ১১ বছরের শিক্ষাজীবনে আন্তর্জাতিক মান থেকে এ দেশের শিক্ষার্থীরা কমপক্ষে সাড়ে চার বছর পিছিয়ে থাকে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মুসলিমপ্রধান দেশ হওয়ায় গত কয়েক দশকে মাদ্রাসা শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিক করার জন্য উদ্যোগ নিয়ে আসছে সরকার। মাদ্রাসা শিক্ষাকে এসএসসি ও এইচএসসির সমমানে অন্তর্ভুক্তির পর ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। তাছাড়া পরবর্তীকালে ফাজিল ও কামিলের মানকে ডিগ্রি ও মাস্টার্সের সমমানে অন্তর্ভুক্ত করার পর এ খাতের শিক্ষার্থী আরও বেড়েছে।

মাদ্রাসা শিক্ষা সাধারণত দুই ধরনের। একটি হলো কওমি, আরেকটি আলিয়া। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় কোনো সনদ ছাড়াই শুধু ধর্মীয় শিক্ষাই নিয়েছিল। মানুষদের আকৃষ্ট করতে বর্তমানে সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে মিল রেখে ক্যাডেট মাদ্রাসা নামের ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে অনেক। এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিও অনেক উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিও আগ্রহী হয়ে উঠছে।

দেশের আলেমরা বলছেন, মূলধারার শিক্ষা ব্যয়বহুল হওয়ায় মানুষ অপেক্ষাকৃত কম খরচে মাদ্রাসা শিক্ষাকেই বেছে নেয়।

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের প্রধান পরিচালক মাওলানা ওবায়দুর রহমান খান নদভী দেশ বলেন, ‘সাধারণ শিক্ষায় ব্যয় অনেক বেশি। সে তুলনায় মাদ্রাসায় অনেক কম।’ তিনি বলেন, ‘মূলধারার শিক্ষায় ভবিষ্যৎ নেই। চাকরি নেই, উদ্যোক্তা হতে পারে না। অল্পসংখ্যবক লোক চাকরি পায় অথবা বিদেশ চলে যায়। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা তাদের জীবনের চাহিদা ছোট রাখে এবং সেই সন্তুষ্টি নিয়ে চলে।’

বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের তথ্য বলছে, ভারত উপমহাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে আলিয়া ধারার মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার সূচনা হয় ১৭৮০ সালে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। পর্যায়ক্রমে অবিভক্ত বাংলা, বিহার, আসাম ও ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মাদ্রাসা শিক্ষা সম্প্রসারিত হতে থাকে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর মাদ্রাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী ও কর্মমুখী করার উদ্যোগ গৃহীত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড গঠিত হয় এবং ঢাকায় সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া ক্যাম্পাসে এর কার্যক্রম শুরু হয়।

২০০৬ সালের আগপর্যন্ত মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসাগুলো নিয়ন্ত্রণ করত। ২০০৬ সাল থেকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া এবং ২০১৬ সাল থেকে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।

জনশুমারির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২২ সাল শেষে সাক্ষরতার হার দাঁড়িয়েছে ৭৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। ১৯৭৪ সালের শুমারিতে যা ছিল ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ। ১৯৭৪ সালে এমন জনগোষ্ঠী ছিল ৭৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ, ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৭৭ শতাংশে।

শুমারির তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে কমপক্ষে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়–য়া নাগরিক রয়েছে ২৫ দশমিক ৯১ শতাংশ, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে ১৬ দশমিক ১৮ শতাংশ, নবম বা দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে ৭ শতাংশ নাগরিক। তাছাড়া এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় পাস করা নাগরিক রয়েছে ৮ দশমিক ৮২ শতাংশ, এইচএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় পাস করা রয়েছে ৭ দশমিক ৮২ শতাংশ।

দেশে স্নাতক বা সমমান পাস করা নাগরিক ২০২২ সাল শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। অথচ আগের শুমারিতেও এ হার ছিল মাত্র ১ দশমিক ৯২ শতাংশ। দেশে বর্তমানে স্নাতকোত্তর বা সমমানের পাস করা নাগরিক রয়েছে ১ দশমিক ৭২ শতাংশ। অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত নাগরিক রয়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ।

Facebook Comments Box
এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

ফেসবুকে আমরা

© স্বত্ব সংরক্ষিত। © ২০১৬ প্রথম চট্টগ্রাম। @ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
প্রযুক্তি সহায়তায় Shakil IT Park