1. admin@prothomctg.com : admin :
বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৯:৫৫ অপরাহ্ন

‘ফালতুতে’ কমিশন বাণিজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০২৩
  • ৩৯ বার পঠিত

চট্টগ্রামের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখায় দুর্নীতি-অনিয়মের লাগাম টানা যাচ্ছে না। পাঁচ সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে কমিশন বাণিজ্যে লিপ্ত থাকার অভিযোগে আদালতে মামলা চললেও তাদের বিরুদ্ধে কর্র্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। উল্টো বছরের পর বছর ঘুরেফিরে এলএ শাখাতেই কর্মরত আছেন তারা। কেউ তদবির করে, কেউবা আবার কর্তাদের ম্যানেজ করে চর দখলের মতো এলএ শাখায় কর্মরত থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। মাঝেমধ্যে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শাস্তিমূলক বদলি করা হলেও এলএ অফিস ছাড়ছেন না তারা।

কমিশন বাণিজ্য নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে শিরোনাম হওয়ার পর কৌশল পাল্টেছেন তারা। সেবাপ্রার্থীর সঙ্গে দর-কষাকষির জন্য সঙ্গে রাখছেন কিছু বহিরাগত ব্যক্তি। যারা এলএ শাখায় আসা সেবাপ্রার্থীদের কাছে ‘ফালতু’ নামে পরিচিত।

এলএ শাখার যেসব সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়মের মামলা তদন্তাধীন তারা হলেন মোহাম্মদ আব্দুল মমিন, ইমাম হোসেন গাজী, জোবায়েরুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম ও আবু কায়সার সোহেল। আর তাদের কমিশন বাণিজ্যের সহযোগী হিসেবে ভুক্তভোগীদের কাছে যাদের নাম শোনা যায় তারা হলেন এলএ শাখার অফিস সহকারী লিটন দাশ, মোজাফফর ও হিসাবরক্ষক মো. আলী এবং একজন গভর্নমেন্ট প্রসিকিউটর (জিপি)।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি কর্মচারী না হয়েও দিনভর এলএ শাখায় বিচরণ করে ‘ফালতুরা’। অফিস স্টাফের মতো ঘাঁটাঘাঁটি করে অফিসের কম্পিউটার। দৌড়ঝাঁপ করে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিয়ে। কখনো কখনো গায়েব করে দেয় গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র। আর এই ফালতুদের দিয়ে বাইরের কম্পিউটার টাইপিং দোকান থেকে আলোচিত সার্ভেয়াররা আবেদনকারীর জমির ক্ষতিপূরণের রিপোর্ট প্রস্তুত করান বলে অভিযোগ রয়েছে। ফালতুদের মধ্যে আছে হাটহাজারীর তৌহিদ, সন্দ্বীপের মো. হৃদয়, মিরসরাইয়ের শিপন, বাঁশখালীর রিফাত, কর্ণফুলী থানা এলাকার আইয়ুব আলী, আনোয়ারা উপজেলার আবদুল মান্নান, আবু সাদিক, বোরহান ও গিয়াস উদ্দিন।

জানা গেছে, ১৯ বছরের চাকরিজীবনে সার্ভেয়ার মোহাম্মদ আব্দুল মমিন প্রায় এক যুগ ধরে ঘুরেফিরেই আছেন এলএ দপ্তরে। মাঝেমধ্যে অন্য কোথাও বদলি করা হলেও অল্প দিনেই চলে আসেন এলএ শাখায়। চার বছর ধরে একই শাখায় কর্মরত আছেন সার্ভেয়ার ইমাম হোসেন গাজী। জনশ্রুতি আছে, সাবেক জেলা প্রশাসক ইলিয়াছ হোসেনের সময়ে ইউসিবিএল ব্যাংকে ঘুষের টাকাসহ গোয়েন্দাদের হাতে ধরা পড়েন সার্ভেয়ার জোবায়েরুলের ‘ফালতু’ হিসেবে কাজ করা রিপন। এ ঘটনা জানার পর সার্ভেয়ার জোবায়েরুলকে স্ট্যান্ডরিলিজও করা হয়েছিল। কিন্তু এই জোবায়েরুল চলতি বছরের শুরুর দিকে পুনরায় ফিরে আসেন এলএ দপ্তরে।

জানা গেছে, গত বছরের ১১ নভেম্বর ঘুষ দাবি এবং মারধরের অভিযোগে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল দেবের আদালতে একটি মামলা করেন নগরীরর হালিশহর থানার সবুজবাগ এলাকার বাসিন্দা মো. হেমায়েত হোসেন। এতে এলএ শাখার সিনিয়র সহকারী কমিশনার এহসান মুরাদ (বদলি হয়ে গেছেন), সার্ভেয়ার মোহাম্মদ আব্দুল মমিন, সার্ভেয়ার মোহাম্মদ ইমাম হোসেন গাজী ও সার্ভেয়ার আবু কাউসার সোহেলসহ ছয়জনকে আসামি করা হয়। তবে মামলাটি তদন্ত করে বিবাদীদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা মেলেনি জানিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছে তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

এ প্রসঙ্গে মামলার বাদী হেমায়েত হোসেন বলেন, ‘পতেঙ্গার টানেল প্রকল্পের জন্য আমার কিছু জমি অধিগ্রহণ করে সরকার। ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে সার্ভেয়ার ইমাম হোসেন গাজী আমার কাছে ঘুষ দাবি করেন। প্রতিবাদ করলে অন্য সার্ভেয়াররা আমার ওপর চড়াও হন। পিবিআই যে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে, আমি তা প্রত্যাখ্যান করে আদালতে নারাজি দিয়েছি। আমি আদালতের কাছে ন্যায়বিচার চাই।’

আরেক ভুক্তভোগী পটিয়া উপজেলার আশিয়াম এলাকার বাসিন্দা ফরিদ উদ্দিন। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য তার ভগ্নিপতির মালিকানাধীন কিছু জমি অধিগ্রহণ করে জেলা প্রশাসন (এলএ কেইস ৩০, ১৬/১৭ ও ৩৫, ১৭/১৮)। লিখিত আপত্তি, পাওয়ার অব অ্যার্টনি বাতিল, আদালতে মামলা থাকা সত্ত্বেও সার্ভেয়ার আবু কায়সার সোহেল এবং তার সঙ্গে ফালতু হিসেবে থাকা আবু সাদিক যোগসাজশ করে জমির ক্ষতিপূরণের ৬০ লাখ টাকা ভুয়া মালিককে দিয়ে দেন। আবু সাদিকের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে প্রতারণার একটি মামলা বিচারাধীন আছে।

নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মাস্টার ওয়ারেন্ট অফিসার আমিরুল ইসলামও প্রায় একই ধরনের অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম নগরের আউটার রিং রোডের জন্য তার মালিকানাধীন ৭ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এলএ অফিসের সাবেক কর্মকর্তা দেবতোষ চক্রবর্তী ও সার্ভেয়ার শহীদুল ইসলাম মুরাদসহ কয়েকজন যোগসাজশ করে তার জমির ক্ষতিপূরণের প্রায় ৩৭ লাখ টাকা অন্য ব্যক্তিকে দিয়ে দেন। এ নিয়ে আদালতে মামলা করেন। অভিযোগের সত্যতা পেয়ে এলএ অফিসের ওই সব কর্মকর্তা ও সার্ভেয়ারদের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেছে দুদক। যার এখনো তদন্ত চলছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাস দুয়েক আগে এলএ শাখার হিসাবরক্ষক মো. আলীকে জেলা প্রশাসকের দপ্তরে বদলি করা হলেও তিনি যাননি সেখানে। এ ছাড়া এলএ শাখায় নানা তদবিরে ব্যস্ত থাকা এক গভর্নমেন্ট প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে আছে জালিয়াতির মামলা। সেটি তদন্ত করছে পিবিআই। কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ থাকলেও সেই সব সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে কর্র্তৃপক্ষ উল্টো ক্ষতিপূরণ প্রদানের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের দায়িত্ব দিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এলএ শাখার কয়েকজন সার্ভেয়ার ও কানুনগোর বিরুদ্ধে করা মামলা আদালতে বিচারাধীন বলে জানিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পিপি অ্যাডভোকেট কাজী সানোয়ার আহমেদ লাভলু।

এ বিষয়ে দুদকের চট্টগ্রাম জেলা সমন্বিত কার্যালয় মেট্রো শাখার উপপরিচালক নাজমুস সাদাত বলেন, ‘এলএ অফিসের কিছু সাবেক কর্মকর্তা, সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত চলছে। অনুসন্ধান শেষে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আলোচিত পাঁচ সার্ভেয়ারের অনিয়ম প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (ভূমি অধিগ্রহণ শাখা) তানভীর-আল-নাফীস বলেন, ‘আমি এলএ শাখার দায়িত্ব নিয়েছি কিছুদিন আগে। সার্ভেয়ারদের বিষয়ে এই প্রথম আপনার (প্রতিবেদক) কাছ থেকে শুনলাম। তবু তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

একই বিষয়ে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মঞ্জুরুল হাফিজ বলেন, ‘প্রথমত কথা হচ্ছে, অভিযোগ সুনির্দিষ্ট হতে হবে। সার্ভেয়ার বা অফিস সহকারী কার থেকে কখন, কত টাকা ঘুষ নিয়েছেন, সেটা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারলে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারি। দ্বিতীয়ত, কিছু লোক আছে যারা এলএ দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাছে সুবিধা না পেয়ে সংশ্লিষ্ট অফিসারের বিরুদ্ধে মামলা বা অভিযোগ দিয়ে থাকেন। যেকোনো অফিসার বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু মামলা হওয়া বা দোষী সাব্যস্ত হওয়া অন্য বিষয়।’

কয়েকজন সার্ভেয়ার বছরের পর বছর ঘুরেফিরে এলএ শাখায় কর্মরত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মঞ্জুরুল হাফিজ এ জন্য লোকবল সংকটকে দায়ী করেন।

Facebook Comments Box
এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

ফেসবুকে আমরা

© স্বত্ব সংরক্ষিত। © ২০১৬ প্রথম চট্টগ্রাম। @ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
প্রযুক্তি সহায়তায় Shakil IT Park