1. admin@prothomctg.com : admin :
বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১২:৪২ অপরাহ্ন

ছোটদের নজরুল

নাজনীন বেগম
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ২০ মে, ২০২৩
  • ৪৭ বার পঠিত

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলা সাহিত্যের গগনে এক প্রবল ঝড়ো হাওয়া। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে নিত্যজীবন প্রবাহ অশান্ত ঝড় ঝাপটায় বিপন্ন হতে হয়েছে নজরুলকে সেই শৈশবকাল থেকে। ১৮৯৯ সালের ২৫ মে বাংলা ১১ জ্যৈষ্ঠ নজরুলের জন্ম। অতি বাল্যকাল থেকে সংগ্রামী বৈতরণী পার হতে হয়েছে ছোট্ট নজরুলকে। জীবনটা সুখ আর স্বস্তিদায়ক কখনোই ছিল না। আশৈশব পিতৃহারা নজরুল জন্মদাত্রী মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ ইতিবৃত্তও আমাদের ব্যথিত করে। সঙ্গত কারণে জীবন ও জীবিকার তাড়নায় বালক নজরুলকে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন স্থানে।

ছোট্ট সোনামণিরা তোমরা যারা মায়ের আদর আর বাবার নিকটতম সান্নিধ্যে নিজেদের তৈরি করছ, নজরুলের তেমন সুযোগ কিংবা পরিস্থিতি বরাবরই প্রতিকূলে থেকেছে। পিতা ফকির আহমদ ও মাতা জাহেদা খাতুনের অতিকষ্টের সন্তান বাংলা সাহিত্যের দিকপাল এই নজরুল। শৈশবকালীন নামই তো ছিল দুখু মিয়া। জীবনভর পাড়ি দিতে হয়েছে অন্তহীন দুঃখের সমুদ্র। কিন্তু সেই ছোট বেলা থেকে এক অবোধ বালক তার প্রতিভাদীপ্ত মননের স্ফুরণ ঘটিয়ে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন।

পারিবারিক স্নেহ বন্ধনের শৈথিল্যে মায়ের সঙ্গে ক্রমাগত বিচ্ছিন্নতায় নিজের মতো তৈরি হতে হয়েছে বালক নজরুলকে। ঘুরে বেড়ানোর অস্থির যাযাবর জীবন কখনো নির্বিঘœ আর নিরাপদ ছিল না। ফলে অতি অল্প বয়স থেকেই তিক্ত-অভিজ্ঞতার বিদগ্ধ চিত্র এই বিপ্লবী সত্তাকে লড়াকু জীবনের পালাক্রম অতিক্রম করতে দুঃসাহসীও করে তুলতো। মাথার ওপর ছাদ কিংবা অভিভাবকের ছায়া ব্যতিরেকে বালক কবিকে কত কিছু যে করতে হয়েছে সেটাও এক পরম বিস্ময়। বিস্ময়কর এই বালক ইমামতি করা থেকে শুরু করে খাদেমগিরিতে নিজেকে সমর্পণ করে আবার মোল্লাগিরিতেও তার সক্ষমতায় সকলের নজর কাড়তে সময়ও লাগত না।

জয়েন্টের ব্যথা একবারেই চলে যাবে
জয়েন্টের ব্যথা শেষ করার একটি সহজ উপায়

জয়েন্টের ব্যথা একবারেই চলে যাবে
জয়েন্টের ব্যথা শেষ করার একটি সহজ উপায়

অবিভক্ত বাংলার (এখন পশ্চিমবঙ্গ) বর্ধমানের চুরুলিয়া গ্রামে নজরুলের জন্ম, শৈশবকাল অতিক্রম করা এক বৈচিত্র্যিক ঘটনা পরম্পরার বেসামাল পথযাত্রা। কট্টর ধর্মীয় আবহে এক বালকের ইমামতি করা ভাবা যায় কি? মাজার পরিচর্যা কিংবা মোল্লাগিরিও অস্বাভাবিক এক ভিন্নমাত্রার জীবন তরী বয়ে চলা তো বটেই। যে বয়সে তোমরা বাবা-মার স্নেহাতিশয্যে নিজেদের ভরিয়ে রেখেছÑ তাদের যত্নে, আদরে কঠিন জীবনকে বুঝতেই পারছ না- তেমন বয়সে নজরুলের অবস্থা সত্যিই এক ক্রান্তিকাল পার হওয়া। ঘাত-প্রতিঘাতের বিক্ষুব্ধ প্রতিবেশে কখনো ঠান্ডা মাথায় নজরুলকে শান্তও থাকতে দেয়নি। তাই তো বিদ্রোহীসত্তা, বিপ্লবী চেতনায় সব যেন দুমড়ে মুচড়ে একাকার করতে চেয়েছেন। পুরো পাক ভারত উপমহাদেশ তখন পরাধীনতার কঠিন শৃঙ্খলে আবদ্ধ। স্বাধীনতাহীনতায় দেশ ও জাতি তখন অবরুদ্ধতার শক্ত নিগড়ে আষ্টেপৃষ্ঠে আটকানো। এমন জমাটবদ্ধ পরিবেশই শুধু নয় পিতা মাতার স্নেহ থেকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন এক উদীয়মান তরুণ যেন জীবনের চরম অভিঘাতে নিজেকে ছন্নছাড়ার আদলে দাঁড় করানোও কঠিন বাস্তবতা।

তবে এটা সত্য অনন্য এক সৃজনদ্যোতনায় ভেতর থেকে বার বার উদ্বেলিত হতেন অত্যাচার অবিচার আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে। তবে শিশু নজরুলের মাতৃস্নেহের আকাক্সক্ষা সব সময় অন্তর্নিহিত বোধে জিইয়ে থাকতো। সময়ে তা প্রকাশ পেতেও দেরি হয়নি। অনিয়মিত স্কুলে যাওয়া, পাচকের দায়ভাগ বহন করা, রুটি বেলতে নিজেকে তৈরি করা সব যেন কিশোর নজরুলের লড়াকু জীবনের অনিশ্চিত পালাক্রম। কখনো নিজের জেলার চৌহদ্দির মধ্যে নতুবা অন্য কোথাও। যা স্বস্তি, নিরাপদ আর নিশ্চিত গতিপ্রবাহ ছিলই না। এমন বৈচিত্র্যিক অভিযাত্রায় ঘটে যায় অনন্য এক মহাযোগ। ১৯১৪ সালে বেজে ওঠে প্রথম বিশ^যুদ্ধের দামামা। উদীয়মান এই কিশোরের বয়স মাত্র ১৫ বছর। যার হাওয়া এসে লাগে উপনিবেশিক অবিভক্ত পরাধীন ভারতেও। ১৯১৭ সালে ১৮ বছর বয়সে লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে চলে যান যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া বেঙ্গল রেজিমেন্টে। ১৯১৮ সালে থেমে যাওয়া এই যুদ্ধের রেশ কাটতে লেগে যায় আরও ৩ বছর। আর সৃষ্টিশীল তরুণ প্রজন্ম নজরুল নতুন এক ভাব সম্পদে ভেতরের প্রচ্ছন্ন থাকা বোধকে নানামাত্রিকে জাগিয়েও তুললেন।

সৃজন উদ্যোমে বেপরোয়া নজরুল নিজেকে আবিষ্কার করলেন অনন্য এক শৈল্পিক সত্তায়। ১৯২০ সালে করাচির সেনা ব্যারাক থেকে ফিরেই নিজের ভেতরের নান্দনিক শৌর্যকে যেন অবিস্মরণীয় এক স্ফুরণে মাতিয়েও দিলেন। নিজে শুধু উদ্বেলিত হলেন না সঙ্গে পরাধীন ভারতকেও যেন জাগিয়ে তুললেন। লিখে ফেললেন ‘বিদ্রোহীর’ মতো এক অজেয়, অমর কাব্যিক সম্ভার। সময়টা ছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অপ্রতিরোধ্য এক সাহিত্যিক বলয়। রবীন্দ্রভক্ত নজরুল নিজের সৃষ্টির অদম্য স্পৃহায় আলাদা এমন এক জগত তৈরি করলেন যা বিশ্ব কবিকেও বিমুগ্ধ চিত্তে নজরুলের প্রতি অনকর্ষিত করে দেয়।

‘বিদ্রোহী’ কবিতা নিজেই পড়ে শুনালেন নজরুল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে। সবার আগে বিস্মিত, বিমোহিত রবীন্দ্রনাথ তার ‘বসন্ত’ নাটক উৎসর্গ করে নজরুলকে কবি হিসেবেও স্বীকৃতি দিলেন। ক্ষিপ্ত হলো কলকাতার বিদগ্ধ মহল। নজরুল তেমন সময়ে অনশনব্রত পালন করে কারাগারে আবদ্ধ। শুধু কি বিদ্রোহী কবিতা। অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন নজরুল ছিলেন অনন্য এক সংগীত স্রষ্টাই নন সাধকও বটে। সবসময় নাকি রবীন্দ্র সংগীতে বিভোর থাকতেন। জনশ্রুতি আছে গীতাঞ্জলির সব গানই নাকি নজরুলের জানা ছিল। এমন সমৃদ্ধ তথ্যটা এসেছে বহু ভাষাবিদ ডক্টর মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর কাছ থেকে। কিন্তু নজরুল যখন গান লিখছেন, সুর দিচ্ছেন কোথাও কোনো রবীন্দ্র ছাপই নেই।

অমর এক সংগীতজ্ঞ নিজের যোগ্য আসনটি চিরস্থায়ীভাবে পাকাপোক্ত করে নিলেন। এখানেই বিদ্রোহী কবির অসাধারণত্ব, নিজেকে চিনিয়ে দেওয়া। স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে বহুমাত্রিক সংগীত সাধনাকে আপন সত্তায় একীভূত করতে অন্য কোনো দিকে তাকাতে পর্যন্ত হয়নি। যাযাবর জীবনের দুঃসময়ে স্বল্প তল্পিতল্পার মধ্যে একটা জিনিস নাকি সবসময় থাকতো তা কিন্তু কবিগুরুর গীতবিতান এবং স্বরলিপির বই। প্রতিভাবান নজরুলকে চিনিয়ে দিতে অন্য কিছুর প্রয়োজনই পড়ে না।

তোমাদের মতো কচি কাঁচাদের জন্য বিদ্রোহী সত্তা কত কোমল কবিতা, শিশু কিশোরদের জন্য হাস্যকর ছন্দবদ্ধ আবেগ স্ফুরণ হতে সময় লাগতো না। ‘ঝিঙে ফুল’ কবিতায় লিখছেন-

শ্যামলী মায়ের কোলে সোনামুখ খুকুরে

আলুথালু ঘুমু যাও রোদে গলা পুকুরে।

আর ‘খুকি ও কাঠবিড়ালি’ কবিতাটি আজও তোমাদের নাড়িয়ে দেয়। তাই নয় কি? খুকি ও কাঠবিড়ালির আবেগ মাখা কথার ফুলঝুড়ি ছন্দোবদ্ধ আবেশে এখনো তোমাদের বিভোর করে দেয়। কত অনুষ্ঠানে এই কবিতার আবৃত্তি তোমরা কত ভাবেই না উপভোগ কর। কালের প্রবাহে যা আজও দীপ্যমান। শিশু কিশোরদের ভালো লাগার কবিতা খাঁদু-দাদু। আর খুকুমণিদের জন্য ‘প্রভাতি’ কবিতা আজ অবধি ঘুম ভাঙানোর নান্দনিক শব্দচয়ন।

খুলি হাল

তুলি পাল

ঐ তরী চললো

এইবার

এইবার

খুকু চোখ খুললো

বিপ্লবী আর বিদ্রোহী মনস্তত্ত্বে জিইয়ে থাকা শিশু মনিদের জন্য অনন্য শিল্প কল্পনা। যে কবির শিশুকাল মোটেও সুখকর এবং স্বস্তিদায়ক ছিল না। কিন্তু বড় হয়েই শিশুর ভাব কল্পনাকে কেমন ভাবে রাঙিয়ে দিলেন। ভাবা যায় কি? আর ‘লিচু চোর’ কবিতাটি আজও যেন সামাজিক কট্টর প্রতিবেশের এক অভাবনীয় রূপকল্প। আশপাশের বিভিন্ন বাগানে কচি কাঁচাদের সুস্বাদু ফলের প্রতি তীব্র আকর্ষণ এখনো যেন তার ধারাবাহিকতা বহন করে চলেছে। মজার এই কবিতাটিতে ফল পেড়ে নেওয়া পরবর্তীতে বাগানের মালীর হাতে ধরা পড়া চিরায়ত এক অনন্য চিত্রে শিশু কিশোরদের ছেলে মানুষির অপরিমেয় ছান্দিক দ্যোতনা। তোমরা জান কি? কবি নজরুলের সৃষ্টিশীল জগত ছিল মাত্র ২০ বছরের। আর সংগীতের ভুবন একেবারে দশ বছরের। এই অল্প সময়ে সংগীত সম্রাট নজরুল কিভাবে নিজের আসন শক্ত থেকে মজবুত করলেন!

Facebook Comments Box
এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

ফেসবুকে আমরা

© স্বত্ব সংরক্ষিত। © ২০১৬ প্রথম চট্টগ্রাম। @ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
প্রযুক্তি সহায়তায় Shakil IT Park