1. admin@prothomctg.com : admin :
বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১২:২১ অপরাহ্ন

উপকূলীয় এলাকায় রেডিও স্টেশন প্রকল্পে চরম অনিয়ম

নিজস্ব প্রতিনিধি, কক্সবাজার
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ৬ মে, ২০২৩
  • ৯৮ বার পঠিত

# ৬২ কোটি টাকার অডিট আপত্তি # অনিয়ম ও দুর্নীতিতে আটকা প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প # পিডির বিরুদ্ধে অভিযোগ মহাপরিচালকের # ৮ বছরে ৩ দফা আরডিপিপি সংশোধনী

উপকূল এলাকা থেকে দূর সাগরের ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত নজরদারির আওতায় আনার লক্ষ্যে ৭টি রেডিও স্টেশন স্থাপনের ২০১৪ সালে প্রকল্প হাতে নেয় নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়। ওই প্রকল্পের আওতায় ঢাকায় একটি ১১ তলা ভবন, কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, কুতুবদিয়া, নিঝুম দ্বীপ, কুয়াকাটা, চরখুকরিমুখরি, দুবলারচরে সাতটি কোস্টাল রেডিও স্টেশন হওয়ার কথা। প্রতিটি সাইটে ২টি ভবন ও একটি টাওয়ার বসবে।

প্রকল্পটির বাজেট ধরা হয় প্রায় ৭৭৯ কোটি টাকা। যার অংশীদার কোরিয়া থাকলেও ৬০ শতাংশের বেশি বাংলাদেশ।

দক্ষিণ কোরিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সামহী পূর্তের (অবকাঠামো) কাজ এবং এলজি করবে আইসিটির কাজ। জিএমডিএসএস স্থাপনের জন্য ইজিআইএমএনএস প্রকল্পের আওতায় দক্ষিণ কোরিয়ান ঋণ ও জিওবি সহায়তায় ২০১৪ সালে সরকারি অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটি ২০১৬ সালে সম্পন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কবলে পড়া প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পটিতে একে একে ৩ দফায় আরডিপিপি সংশোধনী আনা হয়েছে। শেষ বারের মতো তৃতীয় সংশোধনী অনুমোদিত প্রকল্পের মেয়াদ ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। কনসালটেন্ট, কোরিয়ান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সামহী কনস্ট্রাকশনের অসযোগিতা এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনিয়শ-দুর্নীতির কারণে কাজ তেমন এগুচ্ছে না। এখনো অবকাঠামোতে সীমাবদ্ধ। যে কারণে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প সমাপ্তি নিয়ে শংকা করছে সংশ্লিষ্টরা।

মহাপরিচালক দপ্তর সুত্রে জানা গেছে, ২০১৬-২০২০ সালের জুন পর্যন্ত প্রথম দফায় আরডিপিপি সংশোধনী আনা হয়। এই সময়ে প্রকল্প পরিচালক ছিলেন নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এসএম নাজমুল হক। তার সময় কাজ হয়েছে ১০ শতাংশ মতো। দুর্নীতির মামলায় বরখাস্ত হয়ে তিনি জেলে যান। তার পরে দায়িত্বে আসেন একেএম জসীম উদ্দিন সরকার। তিনি ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে এখন অবসরে। তার বিরুদ্ধেও ৬২ কোটি টাকার অডিট অপত্তি ওঠে। তাতে প্রায় ১৩ কোটি টাকার আত্মসাৎ ধরে মন্ত্রণালয়ের অডিট কমিটি। এরই মধ্যে তিনি অবসর গ্রহণ করলেও তার পেনশন আটকে রাখা হয়েছে।

২০২১ সালের ডিসেম্বরে পিডির দায়িত্ব নেন আবু সাইদ মো. দেলোয়ার রহমান। ২০২২ সালের জুন নাগাদ অবকাঠামোগত কাজের সর্বোচ্চ অগ্রগতি হয়েছে ৩৫ শতাংশ। গেল নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এই চার মাসে ৭০ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। এরপর থেকে বিভিন্ন প্রকার অনিয়ম ও দুর্নীতি কারণে গতি বাধাগ্রস্ত হয়।

এসব বিষয় জানিয়ে গত ২০ মার্চ নৌপরিবহন সচিবকে চিঠি লিখেন মহাপরিচালক কমডোর মো. নিজামুল হক।

প্রকল্প পরিচালক আবু সাইদ মো. দেলোয়ার রহমানকে প্রতিস্থাপন প্রসঙ্গে পাঠানো ওই পত্রে তিনি উল্লেখ করেন, আগামী জুনের মধ্যে পূর্তের কাজ শেষ করা না হলে ইকুইপমেন্ট স্থাপনসহ প্রকল্প ২০২৪ সালের জুন মাসের মধ্যে সম্পন্ন করা অসম্ভব মনে হচ্ছে। প্রকল্পের গতি ত্বরান্বিত ও সঠিক সময়ে বাস্তবায়নের স্বার্থে অসযোগিতা ও অদক্ষতার দায়ে কেরিয়ান কনসালটেন্ট মি. পিটারকে ২০২২ সালের অক্টোবরে অব্যাহতি দেওয়া হয়। কোরিয়ান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সামহী কনস্ট্রাকশনের স্থানীয় কর্মকর্তাদের অনিয়ম ও অসযোগিতার জন্য সতর্ক করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

কাজ না করে ঠিকাদারদের বিল প্রদান, মালামাল ক্রয় না করে বিল পরিশোধের মত মারাত্মক অভিযোগও আছে। প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব গ্রহণের সময় বা পরবর্তীতে কোন প্রকার উদ্যোগ না নিয়ে দোষী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দিয়েই প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ আসছে।

এসব বিষয় সামনে আসায় ঠিকাদারদের অর্থছাড় বন্ধ করে দেন প্রকল্প পরিচালক। যে কারণে কাজের গতি কমে আসে, এমনটি অভিযোগ।
কোরিয়ান ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ২ নাগরিক মি কেসপার ও মি. হার, পিডি আবু সাইদ মো. দেলোয়ার রহমান, কর্মকর্তা বিপ্লব জলিল ও প্রতীক প্রবণ দাসের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।

নৌ-পরিবহনমন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক দপ্তর সুত্রে জানা গেছে, কোরিয়ান ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ২ নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে ব্যবস্থা নিতে তাদের প্রতিষ্ঠানকে পত্র লিখেন মহাপরিচালক কমডোর মো. নিজামুল হক। পাশাপাশি পিডিকে প্রতিস্থাপনের জন্য মন্ত্রণালয় বরাবর চিঠি পাঠান। মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে পিএসসি সভা আহবান করেন গেল ৩ এপ্রিল। ১০ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানানোর কথা। এখনো কোন সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় নি। ইতোমধ্যে গেল ২৫ এপ্রিল পিডি আবু সাইদ মো. দেলোয়ার রহমান নৌ-পবিহন মন্ত্রণালয়ের সচিবের নিকট পদত্যাগপত্র জমা দেন।

ইমিগ্রেশন সুত্রে জানা গেছে, কুরিয়ান ২ নাগরিক মি. কেসপার ও মি. হার ২০১৯ সাল থেকে ভিসা জালিয়াতি করে ট্যাক্স ও ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশে অবৈধভাবে অবস্থান করছে জানিয়ে তাদেরকে পাসপোর্টসহ ইমিগ্রেশনে হাজির করতে অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক (এসবি) বরাবর পত্র দেওয়া হয়।

অনুসন্ধান বলছে, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সীল ও লোগো জালিয়াতি করে ভুয়া অনুমোদনের মাধ্যমে আগার গাঁওয়ের ১১ তলা ভবনে ‘ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম’ বসানো হয়। যেখানে কুরিয়ান ২ নাগরিক, সিনার্জি লজিস্টিকসের গফফার সম্পৃক্ত।
পিডি আবু সাঈদ মো. দেলোয়ার রহমানের সঙ্গে বিপ্লব জলিল ও প্রতীক প্রবণ দাস জড়িত বলে জানা গেছে। জিওবি তহবিলের কোন বিল ভাউচার জমা করেন না পিডি।

গত ১৪ জুলাই বালুর স্থানে ড্রেজিং এর কাদা-মাটি দিয়ে জমি ভরাট করে ৬ কোটি ৫৭ লক্ষ টাকার একটি বিল মহাপরিচালকের অনুমোদন ব্যতীত গোপনে প্রকল্প পরিচালক নিজে অনুমোদন দিয়ে পাস করিয়ে নেন। এছাড়া, ডিপিপি-এর জিসিসি ও এসসিসি এর অধিকাংশ কন্ট্রাক্ট ক্লস ভঙ্গ করে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে, শত কোটি টাকার অনিয়ম যখন দৃশ্যমান হয় তখন পিডি আবু সাইদ মো. দেলোয়ার রহমাকে অপসারণ ও নতুন পিডি নিয়োগের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব প্রেরণ করেন মহাপরিচালক কমডোর মো. নিজামুল হক। কিন্তু এখনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় নি। পদত্যাগপত্র দিয়েও বহাল তবিয়তে পিডি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমডোর মো. নিজামুল হক বলেন, ২০২১-২২ অর্থ বছরে ১২১ কোটি টাকা জিওবি থেকে খরচ হয়েছে। যেখানে অধিকাংশের বিল ভাউচার নেই। ২০২২-২৩ অর্থ বছরে ১৭কোটি টাকা মতো খরচ করেছেন পিডি। সরকারি তহবিলের টাকা খরচের হিসাব বছর অনুযায়ী। ২২-২৩ অর্থ বছরে সাড়ে ৫ কোটি টাকার একটি ব্যয় আমার অনুমোদন আছে। ১২ কোটি পিডি করেছেন।

তিনি বলেন, নির্মাতা সহযোগি প্রতিষ্ঠান কোরিয়ান সামিহ কন্সট্রাকশন লিঃ ও বর্তমান প্রকল্প পরিচালকের বিভিন্ন দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের তথ্য পাওয়ায় নৌপরিবহন অধিদপ্তরের একটি অভ্যন্তরীণ অডিট চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পিআইসি সভায় উত্থাপন করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করে নি। অবশেষে কোরিয়ান নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের চারজন সদস্যকে প্রকল্প হতে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সুত্রে জানা গেছে।

নানা অনিয়ম ও অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক আবু সাইদ মো. দেলোয়ার রহমানের নিকট জানতে চাইলে বলেন, অভিযোগসমূহের বিষয়ে সুস্পষ্ট কারণ উল্লেখসহ লিখিত জবাব দিয়েই পদত্যাগপত্র দিয়েছি। তবে এখনো গৃহীত হয় নি। কারণ, ইচ্ছে করলেই পদত্যাগ কিংবা প্রতিস্থাপন করা যায় না। এই জন্য কমিটি করা আছে। তাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

এদিকে একটি সূত্র বলছে, প্রকল্প পরিচালকসহ প্রকল্পের আরো দুই কর্মকতা এবং কোরিয়ান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগে তাকে প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়ায় মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে একটি মহল বিভিন্ন অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে।

দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের রক্ষায় তৎপর হয়েছে একটি মহল। যা প্রকল্পের ভবিষ্যতকে অনিশ্চয়তায় ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Facebook Comments Box
এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

ফেসবুকে আমরা

© স্বত্ব সংরক্ষিত। © ২০১৬ প্রথম চট্টগ্রাম। @ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
প্রযুক্তি সহায়তায় Shakil IT Park