1. admin@prothomctg.com : admin :
বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৯:০৩ অপরাহ্ন

চার কোটি টাকা জলে যাচ্ছে

সুজন ঘোষ, প্রথম আলো:
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২২
  • ৮ বার পঠিত

চট্টগ্রাম নগরের জাতিসংঘ পার্কে চার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুটি সুইমিংপুল ও একটি জিমনেশিয়াম ভেঙে ফেলা হচ্ছে। পার্কটিতে ১১ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে গণপূর্ত অধিদপ্তর। তাই তারা সাত বছর আগে নির্মাণ করা সুইমিং পুল ও জিমনেশিয়াম ভেঙে ফেলতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে (চসিক) চিঠি দিয়েছে। অধিদপ্তর থেকে চিঠি পাওয়ার পর সিটি করপোরেশন সুইমিংপুল-জিমনেশিয়াম অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

অধিদপ্তরের চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘ পার্কে গণপূর্ত অধিদপ্তর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এ জন্য সুইমিংপুল ও জিমনেশিয়াম ভেঙে ফেলতে হবে। এগুলো অপসারণের জন্য চলতি মাসেই নিলাম বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে। ঠিকাদার নিয়োগের এক মাসের মধ্যে স্থাপনাগুলো অপসারণ করা হবে।’

দুই বছর মেয়াদি প্রকল্প
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গণপূর্ত অধিদপ্তর ‘চট্টগ্রাম জেলার পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন জাতিসংঘ সবুজ উদ্যান উন্নয়ন’ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। গত ৪ জুলাই প্রকল্পটি অনুমোদন পায়।

দুই বছর মেয়াদি প্রকল্পের কাজ আগামী ২০২৪ সালের জুনে শেষ হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর উদ্যান রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

প্রকল্পের বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরীকে চিঠি গত মাসের শুরুর দিয়ে পাঠিয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্বে) মোহাম্মদ বদরুল আলম খান।

চিঠিতে বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে পরিকল্পনামন্ত্রী প্রকল্পটির অনুমোদন দিয়েছেন। এখন চট্টগ্রামের গণপূর্ত অধিদপ্তর দরপত্র আহ্বান করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তাই জরুরি ভিত্তিতে পার্কে থাকা দুটি সুইমিংপুল ও একটি জিমনেশিয়াম অপসারণ প্রয়োজন। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মেয়রকে চিঠিতে অনুরোধ জানানো হয়।

যোগাযোগ করা হলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী রাহুল গুহ বলেন, ‘জাতিসংঘ পার্কের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। পার্কের বিদ্যমান স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলতে সিটি করপোরেশনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’

টিকিট কাউন্টার ও দোকান নির্মাণ হবে

ব্যবহার উপযোগী ও আধুনিক সবুজ উদ্যান স্থাপনের জন্য সুপারিশ করেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মোশাররফ হোসেন।

প্রকল্প-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকায় ২ দশমিক ২৭ একর জায়গার ওপর জাতিসংঘ পার্কের অবস্থান। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণ না করায় উদ্যানটি বর্তমানে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বর্ষাকালে উদ্যান ৩ থেকে ৪ ফুট পানির নিচে ডুবে থাকে।

স্থাপত্য অধিদপ্তর আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন সবুজ উদ্যান স্থাপনের জন্য নকশা প্রণয়ন করে। গণপূর্ত অধিদপ্তর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করে।

একপর্যায়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সঙ্গে গণপূর্তের মালিকানা দ্বন্দ্বে উদ্যোগটি স্থবির হয়ে পড়ে। পরে অবশ্য তা নিষ্পত্তি হয়।

নতুন প্রকল্পের আওতায় সীমানাপ্রাচীর, প্রবেশ ফটক, অফিস, দোকান, টিকিট কাউন্টার ও শৌচাগার নির্মাণ করা হবে। হাঁটার জন্য থাকবে আলাদা পথ। বসার জন্য থাকবে আসন। থাকবে ঝরনা। এ ছাড়া উদ্যানে আসা শিশুদের জন্য খেলাধুলা ও শরীরচর্চার সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের উপপ্রধান মীর আহমেদ তারিকুল ওমর সভায় বলেছিলেন, সিটি করপোরেশন সুইমিংপুল ও জিমনেশিয়াম নির্মাণে অর্থ ব্যয় করেছে। সংস্কারের মাধ্যমে এগুলো ব্যবহার করা যায় কি না, তা তিনি জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, জিমনেশিয়াম-সুইমিংপুল পরিকল্পিত ও মানসম্মতভাবে নির্মাণ করা হয়নি।

প্রকল্প এলাকায় অফিস, দোকান ও টিকিট কাউন্টারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মূল্যায়ন কমিটির সভায় প্রশ্ন তোলেন পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের যুগ্ম প্রধান মো. আতাউর রহমান খান।

এ প্রসঙ্গে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা বলেন, উদ্যানটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ছোট অফিসের প্রয়োজন রয়েছে। উদ্যানটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। তবে ভবিষ্যতের কথা ভেবে টিকিট কাউন্টার করা হচ্ছে। আর সেখানে একটি মাত্র দোকান থাকবে। উদ্যানে হাঁটতে ও ঘুরতে আসা মানুষদের জন্য তা করা হবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, জাতিসংঘ উদ্যানের দুটি অংশ। একটি অংশে রয়েছে জিমনেশিয়াম ও সুইমিংপুল। জিমনেশিয়াম-সুইমিং পুল সীমানাপ্রাচীর দিয়ে ঘেরা। মূল ফটকে সব সময় তালা ঝোলানো থাকে। ভেতরে প্রবেশের সুযোগ নেই। বাইরে থেকে উঁকি দিয়ে দেখা যায়, সুইমিংপুল দুটি ময়লা পানিতে ভর্তি।

উদ্যানের আরেকটি অংশের সব জায়গায় সীমানাপ্রাচীর নেই। উন্মুক্ত এই অংশের এক পাশে বৃষ্টির পানি জমে আছে। বসার তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। মাটির স্তূপ ফেলা হয়েছে। এর মধ্যেই বিকেলে লোকজন ঘুরতে আসে।

গণপূর্ত অধিদপ্তর সুইমিংপুল-জিমনেশিয়াম পরিকল্পিত ও মানসম্মতভাবে নির্মাণ করা হয়নি উল্লেখ করলেও তা মানতে নারাজ চট্টগ্রাম সিটির সাবেক মেয়র মনজুর আলম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর সময়ে প্রকৌশলীদের পরামর্শ নিয়েই পরিকল্পিতভাবে সুইমিংপুল-জিমনেশিয়াম নির্মাণ করা হয়েছে।

৪ কোটি টাকার স্থাপনার ব্যবহার মাত্র ১ দিন
সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, জাতিসংঘ পার্কে নির্মিত দুটি সুইমিংপুলের প্রতিটির দৈর্ঘ্য ১২০ ফুট, প্রস্থ ৫০ ফুট। একটির গভীরতা ৮ ফুট, আরেকটির সাড়ে ৮ ফুট।

জিমনেশিয়াম ভবনটি সাত হাজার বর্গফুট জায়গার ওপর গড়ে তোলা হয়েছে। তবে জিমনেশিয়ামের ভেতরে শরীরচর্চার কোনো সরঞ্জাম নেই।

জাতিসংঘ পার্কের অর্ধেক, অর্থাৎ এক একর জায়গার ওপর ২০১২ সালে সুইমিংপুল ও জিমনেশিয়ামের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। তৎকালীন সিটি মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

২০১৫ সালের জুন মাসে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্থাপনাগুলো সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে। একই বছরের জুলাইয়ে সিটির নতুন মেয়রের দায়িত্ব নেন আ জ ম নাছির উদ্দীন। মেয়র বদলের পর পার্কটির সুইমিংপুল-জিমনেশিয়াম কোনো কাজে লাগানো হয়নি।

২০১৬ সালে পার্কের মালিকানা নিয়ে গণপূর্তের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের বিরোধ দেখা দেয়।

নাছির উদ্দীন মেয়র হওয়ার পর উদ্যান, জিমনেশিয়াম ও সুইমিংপুল বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেন। ২৫ বছরের জন্য ইজারা দিতে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সিটি করপোরেশন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।

বাণিজ্যিকভাবে পার্ক ইজারা দেওয়ার উদ্যোগের প্রতিবাদ জানায় গণপূর্ত বিভাগ। তৎকালীন গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন তখন সিটি মেয়রের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ সৃষ্টি হয়। এই দুজন দায়িত্বে থাকাকালে পার্কের উন্নয়নে সিটি করপোরেশন ও গণপূর্ত অধিদপ্তর পৃথকভাবে উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এতে উদ্যানটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।

সুইমিংপুল দুটিতে ২০১৭ সালের ৬ মে এক দিনের জন্য সাঁতার প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থা (সিজেকেএস)। সংস্থাটির সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন তখন সিটি মেয়র ছিলেন।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান বলেন, কোনো একটি প্রকল্প নেওয়ার আগে তার রক্ষণাবেক্ষণ কেমন হবে; কে বা কারা রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করবে; সরকারি, বেসরকারি নাকি সিটি করপোরেশন তা করবে, এসব বিষয় আগেই ঠিক করতে হবে। তা না হলে অর্থের অপচয় ঘটে। জাতিসংঘ পার্কের ক্ষেত্রেও তাই ঘটতে যাচ্ছে। একবার সিটি করপোরেশন কাজ করেছে, এখন গণপূর্ত অধিদপ্তর করতে যাচ্ছে। এভাবে অর্থ অপচয়ের কারণে এসব কাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।

Facebook Comments Box
এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

ফেসবুকে আমরা

© স্বত্ব সংরক্ষিত। © ২০১৬ প্রথম চট্টগ্রাম। @ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত
প্রযুক্তি সহায়তায় Shakil IT Park